বাংলাদেশ আজ এক গভীর নৈঃশব্দ্যের মধ্যে রক্তস্নাত সময় পার করছে। ইতিহাস বলছে, এদেশের মানুষ কখনো অন্যায়ের কাছে মাথানত করেনি—নয় ১৯৫২ সালে, নয় ১৯৭১-এ, নয় ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনেও। প্রতিবারই মানুষ রক্ত দিয়েছে, কিন্তু পরাজয় স্বীকার করেনি।
১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের পর নতুন আশার সূচনা হলেও, রাজনৈতিক দলগুলোর সংকীর্ণ স্বার্থ, জোটগত দ্বন্দ্ব এবং নেতৃত্বের দুর্বলতা সেই স্বপ্নকে পূর্ণতা দিতে পারেনি। এরপর ২০০৭ সালে দেশ আবার গভীর রাজনৈতিক সংকটে পতিত হয়—জরুরি অবস্থা, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং গণতন্ত্রের স্থগিত ধারা আমাদের যাত্রাকে ছিন্ন করে দেয়।
২০১৩ সালের শাপলা চত্বরে যা ঘটেছিল, তা অনেকের কাছে এক গা শিউরে ওঠা স্মৃতি। হাজারো মানুষ রাষ্ট্রীয় শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল—হোক তাদের দাবির পক্ষে বা বিপক্ষে—কিন্তু যেভাবে রক্তপাত ঘটেছিল, তা জাতির মনে স্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।
গুম, খুন, দমন-পীড়নের দীর্ঘ ষোলো বছর মানুষ পার করেছে এক অন্ধকার পর্বে। কিন্তু তারপরও প্রতিবারই মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখতে চেয়েছে।
৩৬ শে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান সেই ব্যর্থতার বৃত্ত ভাঙার এক নতুন প্রয়াস ছিল। কিন্তু তারও পরিণতি হয়েছে হতাশায়। দলীয় কোন্দল, নেতৃত্বের অস্পষ্টতা ও কর্তৃত্ববাদী আচরণ সেই সম্ভাবনাকেও দুর্বল করে দিয়েছে।
আজ আমরা দাঁড়িয়েছি এক সংকটময় প্রশ্নের মুখে—নির্বাচনের মাধ্যমে যদি পরিবর্তন সম্ভব হয়, তবে কেন বারবার তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়?
এই প্রশ্নের গভীরতায় দাঁড়িয়ে মাওলানা আবদুল হাদিম খান ভাসানীর কথা স্মরণ করা প্রয়োজন। তাঁর “আওয়ামী লীগের কথা ও কাজ” গ্রন্থে তিনি লিখেছিলেন:
❝ যতবারই দেশ কোনো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সংকটে পতিত হইয়াছে, ততবারই এই ভোটের আশ্রয় লওয়া হইয়াছে। সংকট পরিত্রাণের একমাত্র পথ হিসাবে ভোট গ্রহণ করা হইয়াছে। কিন্তু সংকটের সুদীর্ঘ রাস্তা পাড়ি দেওয়ার জন্য যদি কেবলমাত্র ভোটের উপর সওয়ার হইয়া চলিতে হয়, তাহা হইলে একদিন দেখা যাইবে—ভোট হইতেছে, কিন্তু জনগণ হাঁটিতেছে বিপরীত দিকে।❞
ভাসানীর এই কথার গভীরতা আজকের বাস্তবতায় যেন ব্যঞ্জনাময় হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের (মিটফোর্ড) সামনের রাস্তায় ঘটে যাওয়া এক হত্যাকাণ্ড সেই প্রশ্নকেই আরও তীব্র করেছে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়—একজন ভাঙারি ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্য দিবালোকে পাথর ছুঁড়ে হত্যা করছে একদল রাজনৈতিক কর্মী। আশপাশে শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে—কেউ প্রতিবাদ করছে না, কেউ বাঁধা দিচ্ছে না।
এই দৃশ্য যেন ফিরিয়ে আনে আইয়্যামে জাহেলিয়াতের সেই অন্ধকার সময়—যেখানে গোত্র-মর্যাদা রক্ষায় মানুষ বছরের পর বছর যুদ্ধ করত, কন্যা সন্তান হলে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো, এবং হিংসা-বর্বরতা ছিল সমাজের নীতি।
রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে যদি বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কার, তরুণ নেতৃত্বের অর্ন্তভুক্তি, স্বচ্ছতা ও দায়িত্ববোধের বিকাশ না ঘটে—তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে চরম অস্থিরতার এক বৃত্ত, যেখানে গণতন্ত্রের লেবেল থাকবে, কিন্তু তার ভিত থাকবে না।
আজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবাদের স্লোগান শোনা যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ, হতাশা ও বঞ্চনার বহিঃপ্রকাশ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে একটি সতর্ক সংকেত দিচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম আর বর্বরতা-ভিত্তিক রাজনীতিকে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।
রাজনীতিকে যদি জনসম্পৃক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও সহনশীল না করা যায়—তবে অচিরেই আমরা ফিরে যাবো ইতিহাসের সেই বর্জনযোগ্য সময়টিতে।
তাই বলতেই হয়—যদি মাসের পর মাস, বছরের পর বছর একই ধরনের সহিংসতা ও দমননীতির পুনরাবৃত্তি ঘটে, যদি দলীয় সংকীর্ণতা সংস্কার না হয়, তবে ‘রক্তের উপর স্তব্ধ বাংলাদেশ’ সত্যিই রূপ নেবে নতুন আইয়্যামে জাহেলিয়াতে—যেখানে স্বপ্ন জন্মাবে না, প্রতিবাদ থেমে যাবে, আর মানুষ আর কোনোদিন ভোটে আস্থা রাখবে না। সময় এবং প্রজন্মের সাথে সংলাপকে সমন্বয় করেই এগিয়ে যেতে হবে। তা না হলে ছায়া গহ্বরের দিকে হাঁটবে বাংলাদেশ।
লেখক- শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়