ক্যাডার মূলত একটি ফরাসী শব্দ যার সারমর্ম মুষ্টিমেয় কিছু কর্মকর্তা। এদের কর্মদক্ষতা, সততা, নৈতিকতা ও শিক্ষা দীক্ষা অন্যদের থেকে কিছুটা আলাদা হবে যেভাবে সমাজের অন্যান্য পেশাজীবীদের থেকে আলাদা শিক্ষাগত যোগ্যতা, মান মর্যাদা, জীবনাদর্শ ও সামাজিক অবস্থান হওয়ার কথা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের। তবে পেশা দুটোর ধরন ও কার্যবিধি অনেকটাই বিপরীতমুখী। কোনটির সাথে কোনটির তুলনা করা বাহুল্য মাত্র। পেশা দুটো বস্তুত কোন উন্নত রাষ্ট্র ব্যবস্থার দুটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রধান কাজ উন্নত শিক্ষা ও প্রশিক্ষন প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কল্যাণ সাধনে দক্ষ ও টেকসই মানব সম্পদ তৈরী করা। নিত্য নৈমিত্তিক গবেষণা ও নিয়মিত পড়াশোনা চর্চা করে সৃজনশীল কর্মপন্থাসমূহ উদ্ভাবন তাদের আরেকটি পেশাগত দায়িত্ব। কোন ভাবে এর ব্যত্যয় ঘটলে সেটি হবে পেশাগত আমানতদারির খেয়ানত মাত্র যা বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই ঘটছে। পাশাপাশি নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাসহ আনুসঙ্গিক আরও অনেক কার্যাবলী তাদের সম্পাদন করতে হয়।
অন্যদিকে ক্যাডার সার্ভিসের প্রধান কাজ সরকারের প্রতিটি নির্বাহী আদেশের সঠিক ও সুষ্ঠু বাস্তবায়ন। এখানে দক্ষ ও উন্নত প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত মানব সম্পদ সরকারের প্রতিনিধি হয়ে উদ্ভাবিত ও প্রচলিত সকল কর্মপন্থার নিয়মতান্ত্রিক অনুশীলন ও প্রয়োগের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের জনগনের সেবা করবে। কোন ভাবে কাজটি করতে দ্বিমত পোষন করলে বিষয়টি হবে রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল যদিও অনেক ক্ষেত্রে সেটিই হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্মানিত শিক্ষক-গবেষক মন্ডলী ও ক্যাডার সার্ভিসের চৌকস কর্মকর্তাগন ব্যাটে-বলে সমন্বয় করে কাজ করলে উন্নত রাষ্ট্র ব্যবস্থা বিনির্মানে প্রজাতন্ত্রের সন্মানজনক এই পেশা দুটোর মধ্যে তুলনা, সাদৃশ্য কিংবা বৈসাদৃশ্য নিয়ে ভাবার কোন সুযোগ নেই। প্রত্যেকের উদ্দেশ্য হবে দেশ ও দশের কল্যাণে স্বীয় দায়িত্ব পালন করা যার অপর নাম পেশাগত আমানরদারি। কে কার থেকে বড় এটা না ভেবে বরং দায়িত্ব পালনে কে কতটা বেশী সচেষ্ট সেই আত্ম জিজ্ঞাসার লালন, অনুশীলন ও প্রতিযোগীতা পেশা দুটোর মান মর্যাদাকে করতে পারে আরো সমৃদ্ধ। ক্যাডার সার্ভিসের প্রশাসনিক ক্ষমতা নিয়ে ক্যাডার কর্মকর্তাদের গর্ব করার কিছুই নেই যা বস্তুত প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের নাগরিকগনের প্রতি আমানতদারি মাত্র। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গবেষকদেরও নিজেদের বিদ্যা বুদ্ধি নিয়ে হামবড়া ভাব প্রদর্শনের কোন সুযোগ নেই কারন তাদের মেধা ও জ্ঞানের স্বীকৃতি স্বরূপ রাষ্ট্র তাদের সন্মানজনক এই পদে বসিয়েছে শুধু রাষ্ট্রের প্রভূত কল্যাণ ও উন্নয়ণ সাধনে।
তাই রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে দুটো পেশাতেই পেশাগত উৎকর্ষ সাধনের বিকল্প নাই যদিও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে উল্টোটাই ঘটছে। পেশাগত আদর্শ থেকে মুখে নৈতিকতার বুলি আওড়ালেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকের কার্যকলাপ সম্পূর্ন বিপরীত চিত্র বহণ করে যারা প্রকৃতপক্ষে শিক্ষকতা পেশার মান মর্যাদা ক্ষুন্ন করছেন। অন্যদিকে ক্যাডার সার্ভিসেও কর্মকর্তাদের বিরাট একটি অংশ দুর্নীতি করে দেশ ভাসিয়ে দিচ্ছেন, গুছিয়ে নিচ্ছেন নিজেদের আখের যারা প্রকৃত পক্ষে রাষ্ট্রের জনগনের সাথে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। একেকজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা পাহাড়সম দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি অর্জন করে রাতারাতি গরীব থেকে বিত্তশালী বনে যান।
সরকারী পেশাজীবীদের এই দুর্নীতিবাজ সম্প্রদায় ‘ক্যাডার’ শব্দটির তাৎপর্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ। বিসিএস পরীক্ষার রেজিষ্ট্রেশন কালে তারা আসলে ক্যাডার শব্দটিকে সন্মান করে ক্যাডার পছন্দ দেন না। বস্তুত অবৈধ পন্থায় অর্থবিত্ত উপার্জন ও ক্ষমতার দাপট সামনে রেখে সমাজে উচ্চাসন লাভ করাই তাদের মূখ্য উদ্দেশ্য। উনাদের এহেন কার্যকলাপের কারনেই ক্যাডার সার্ভিসের মান মর্যাদা ক্ষুন্ন হচ্ছে। দেশের আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা খাতের বিরাজমান এই করুন দশার নেপথ্যে তাদের পেশাগত দুর্বৃত্তায়ন বিরাট ভূমিকা রাখছে। পেশাদার এই দুর্নীতিবাজ সম্প্রদায় যুগে যুগে সকল ফ্যাসিজমের মূল কারিগর, পৃষ্ঠপোষক ও চালিকা শক্তি। সরকারের এমন কর্মকর্তারা নিজেদের হীণ স্বার্থ বাস্তবায়নে সরকারকে ভুল পরামর্শ দিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট করে এক সময় জনগনের প্রতিপক্ষ বানিয়ে দেন।
এদের উদ্দেশ্য বিরাজনীতিকরন প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন এবং জনবিচ্ছিন্ন সরকারকে নিজেদের হাঠের মুঠোয় রাখা যার অপর নাম গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে প্রতিষ্ঠিত আমলাতন্ত্র। অন্যদিকে যখন স্বার্থ ও প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় তখন তারা সরকারকে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলতে পর্যন্ত দ্বিধা বোধ করে না যা অনেকটা রূপকথার উপন্যাসে বর্ণিত মুনিবের সাথে ভৃত্যের কৃত বিশ্বাসঘাতকতার মত। তাই কোন ইস্যুতে সরকারকে এক তরফাভাবে দায়ী করার পূর্বে জন সম্মুখে এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার মুখোশ উন্মোচন করে তাদের শাস্তির ব্যাপারে কঠোর আইনের বাস্তবায়ন অপরিহার্য। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের পাশাপাশি অবৈধভাবে অর্জিত তাদের সব সম্পদ ও সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করে নেয়া উচিৎ।
অন্যথায় প্রভূ মহলের সবুজ সংকেত পাওয়া মাত্র এই দুর্নীতিবাজরা অবৈধ পন্থায় অর্জিত অর্থবিত্ত খরচ করে নিজেদের স্বার্থে কখনো বিনা ভোট, ডামি ভোট, আবার কখনো-বা মধ্য রাতের প্রহসন মূলক নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দমত ফ্যাসিস্ট সরকার মনোনয়নের নীল নকশা প্রণয়ন করেন। সরকার পতন বা পরিবর্তন হলে রাতারাতি রাজনৈতিক দর্শণ ও সমর্থন পাল্টে তারা নব্য ক্ষমতাধর রূপে আবির্ভূত হন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ও নীতি নির্ধারনে। বিষয়টা যেন ‘ওল্ড ওয়াইন ইন এ নিউ বটল’ এর মত। এভাবে প্রজাতন্ত্রের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা সব সরকারের আমলেই বহাল তবিয়তে রয়ে যান এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার মধ্যমনি হয়ে ঘুণ পোকার মত প্রজাতন্ত্রের বিনাশ সাধন করেন ঠিক যেভাবে কাঠ নির্মিত আসবাবকে কুঁড়ে কুঁড়ে শেষ করে দেয় সত্যিকারের ঘুণ পোকা।
ক্যাডার সার্ভিসে দেখা যায় তুখোর মেধাবী ও কর্মদক্ষ হওয়া সত্ত্বেও অনেক চৌকস অফিসার পেশাদার দুর্নীতিবাজদের নিকট কোনঠাসা ও ধরাশায়ী হয়ে থাকেন যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে অনেক অসাধারণ মেধাবী ও নিবেদিতপ্রান শিক্ষক থাকেন দলদাস শিক্ষকদের নিকট অসহায় এবং পদে পদে হন তাদের করুণার মুখাপেক্ষী। পক্ষ দুটোর মাঝে সম্পর্কের ধরন হয় অনেকটা প্রভু-ভৃত্যের মত। এখানে মুনিবের দ্বারস্থ না হলে ভৃত্যের হয় না কোন কল্যাণ সাধন। কারো নিয়োগ ও পদোন্নতি লাভ, কোন পদ-পদবি অর্জন কিংবা নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষা ছুটি থেকে প্রেষণে নিয়োগ লাভ পর্যন্ত সব কিছুই হতে পারে এই প্রকল্পের আওতাধীন। এই দলীয় সেবাদাস সম্প্রদায় নিকট অতীতে ফ্যাসিজমের আশীর্বাদে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে অনেক নিষ্ঠাবান, সৎ ও মেধাবী শিক্ষককে গায়ের জোড়ে দাবিয়ে রেখেছেন শুধু নিজেদের হীণ স্বার্থ চরিতার্থে।
জুলাই বিপ্লব চলাকালে এদের কেউ কেউ ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরী মোড়ে গাড়ীতে বোমা ফেলার ইন্ধন জুগিয়ে আগুন পর্যন্ত লাগিয়ে দেন। উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিপদে ফেলে ফ্যাসিস্ট সরকারের মনোরঞ্জন সাধন যদি এই উসিলায় সরকারের নিকট থেকে আরও কোন পদ পদবি, হরিলুটের প্রকল্প বা বিশেষ কোন আশীর্বাদ বাগিয়ে নেয়া যায়। অনেকে আবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্ত্বপূর্ন প্রতিষ্ঠানে প্রেষণে কর্মরত থাকা অবস্থায় কৃত দুর্নীতির দায়ে দুদকের দাগী আসামী হওয়া সত্ত্বেও একদিকে মুখে বড় বড় বুলি আওড়িয়েছেন, অন্যদিকে নিজ নিজ বিভাগে সহকর্মীদের উপর চালিয়েছেন অত্যাচারের স্টীম রোলার। নিজেদের অপকর্ম ধামাচাপা দিতে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সদা ষড়যন্ত্র ও মনগড়া কুৎসা রটনাই ছিল তাদের কাজ। এমনকি গবেষণার ধারে কাছে না যেয়েও জোরপূর্বক ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্যের গবেষণা প্রবন্ধে নিজেদের নাম অন্তর্ভূক্ত করতে বাধ্য করেছেন। এদের কেউ কেউ ৫ আগস্ট, ২০২৪ তারিখে রাতের আঁধারে প্রান রক্ষার্থে বিসিএসআইআরসহ বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সপরিবারে পালিয়ে গিয়ে সেনানিবাসে আশ্রয় নেন। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী-জনতার হাতে প্রাণনাশ হলে এই দুর্নীতিবাজ ও তথাকথিত প্রগতিশীল সম্প্রদায় আজ বাংলাদেশকে জঙ্গী রাষ্ট্রের তকমা লাগিয়ে দিতেন।
তবে এই দলদাস শিক্ষকরা যেকোন সরকারের আমলেই নিরাপদে থাকেন। সরকার পরিবর্তন হলে কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারের সাথে ভারসাম্য রক্ষা করে চলেন। আবার কেউ কেউ রাতারাতি নীল থেকে সাদা বা সোনালী থেকে রূপালী রঙ ধারন করে নিজ রাজনৈতিক পরিচয় বদলে ফেলেন, অর্থাৎ নীতি নৈতিকতা না থাকলে পেট পূজার স্বার্থে যা যা করার সবই তারা করে থাকেন।
বস্তুত শিক্ষকদের এই পদস্খলিত অংশ বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে শিক্ষা, গবেষণা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চায় অগ্রযাত্রার পথে প্রধান অন্তরায়। এবাবেই তাদের মুখে একদিকে থাকে নৈতিকতার বুলি, অন্যদিকে তারা ঘুণ পোকার ন্যায় কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোকে। সত্যিকারের শিক্ষক ও গবেষকদের আগ্রযাত্রা ব্যাহত করে জাতীয় উন্নয়ণের মূল ভিত্তি শিক্ষা ও গবেষণাকে করে দিচ্ছেন পঙ্গু। জাতির বিবেক বলে পরিচিত এই শিক্ষক সম্প্রদায় প্রকৃতপক্ষে জাতির আজন্ম শত্রু।
পক্ষান্তরে, শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রবান্ধব সৎ ও নিষ্ঠাবান শিক্ষকরা পরিনত হয়েছেন এক হতভাগা সম্প্রদায়ে। নিয়ম নীতি ও সততার বাণী অন্তরে ও মুখে ধারন করে সারাটা জীবন তারা শুধু কষ্টই করে যান। তাদের মূল্যায়ণ হয় কেবল সরকারের সংকট কালীন সময়ে যখন দুধের মাছিরা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে নব্য পন্থায় নিজেদের আখের গোছানোতে ব্যস্ত থাকেন।
পরিশেষে বলতে হয়, সততা, নৈতিকতা ও দেশপ্রেম শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় না। এটা মূলত পারিবারিক ও ধর্মীয় শিক্ষার ধারাবাহিকতা মাত্র। সততা ও নৈতিকতার ধারাটি বংশগতভাবে অর্জিত মজ্জাগত একটি শিক্ষা যা মানব দেহের রক্তের শিরায় উপশিরায় প্রবাহিত হয়। তাই সরকারি চাকুরীসহ যেকোন নিয়োগের পূর্বে প্রত্যেক প্রার্থীর পরিবারের অতীত ব্যাক গ্রাউন্ড ভালো করে খতিয়ে দেখা উচিৎ। অন্যদিকে চাকুরীতে প্রবেশের পর কেউ দুর্নীতি করলে তাকে কঠোর আইনের আওতায় আনার কোন বিকল্প নেই, সেটা মৃত্যুর পরে হলেও। কারো অকাল প্রয়াণ যেমন অপ্রত্যাশিত ঠিক তেমনই উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র ব্যবস্থা বিনির্মানে দুর্নীতি দমনে যেকোন ধরনের শৈথিল্য প্রদর্শনও অনাকাঙ্খিত। মহাণ আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুমতি দান করুন (আমীন)।
ড. মোঃ এরশাদ হালিম
অধ্যাপক ও গবেষক
সিন্থেটিক অর্গানিক কেমিস্ট্রি এ্যান্ড কম্পোজিট ম্যাটেরিয়ালস
রসায়ন বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।