Oplus_0
আজ ১৪ জুলাই। জুলাই অভ্যুত্থানের মোড় ঘোরানোর দিন। সেদিন রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা হলগুলো থেকে মিছিল নিয়ে নেমে পড়েন রাজপথে। স্লোগানে স্লোগানে রাতের নিস্তব্ধতা খানখান করে জানিয়ে দেন ভয়কে জয় করার বার্তা। সেদিনের সম্মুখ সারির দুই শিক্ষার্থী এক বছর পর সমকালের সঙ্গে ভাগাভাগি করেছেন তাদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা।
২০২৪ সালের কোটা আন্দোলনের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল নারীদের সরব ও সাহসী অংশগ্রহণ। যেখানে নারীদের জন্য বরাদ্দ ছিল ১০ শতাংশ কোটা, সেখানে নারীরাই প্রথম সেই কোটা প্রত্যাখ্যান করে রাজপথে নেমে এসেছিল মেধা, ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে। এটি ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানোর ঐতিহাসিক নজির, যার নেতৃত্বে ছিল রোকেয়া হলের সাহসী ছাত্রীরা।
১৪ জুলাই ২০২৪, যখন তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বংশধর’ বলে তাচ্ছিল্য করেন, ঠিক সেই রাতে রোকেয়া হলের মেয়েরা ফুঁসে ওঠে। সন্ধ্যা থেকেই হলে এক ধরনের থমথমে উত্তেজনা ছিল। রাত ১০টার দিকে ছেলেদের হল থেকে প্রতিবাদের আওয়াজ ভেসে আসতে শুরু করলে রোকেয়ার মেয়েরা আর চুপ থাকতে পারেনি।
হলের সব ভবনের মেয়েরা থালা-বাটি বাজিয়ে ‘তুমি কে, আমি কে’ স্লোগানে গর্জে ওঠে। নেমে আসে মাঠে; রোকেয়ার হলমাঠ সেদিন পরিণত হয় জীবন্ত শাহবাগে।
সেই রাতে আমরা যারা আন্দোলনের সম্মুখ সারিতে ছিলাম, আমরা সিদ্ধান্ত নিই– প্রতিবাদ হলের গণ্ডির মধ্যে নয়, রাজপথে হবে। আমরা জবাব দিয়েছি, রাজাকারের তকমা ছুড়ে মেরেছি স্বৈরাচারের মুখে।
প্রথমে আমরা যাই শামসুন নাহার হলের সামনে, তখনও তারা বের হয়নি। আমরা গেটে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিতে থাকি। সঙ্গে সঙ্গে শামসুন নাহার হলের মেয়েরাও আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। একত্রে স্লোগান দিতে দিতে আমরা রাজু ভাস্কর্যের দিকে যাত্রা করি। সেই রাত বদলে দেয় আন্দোলনের গতি, বদলে দেয় বাংলাদেশের ইতিহাস।
প্রথম দিকে রোকেয়ার মেয়েরা বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলনে অংশ নিলেও আমরা– আমি, আদিবা, আনিকা– প্রতিদিন থালা-বাটি বাজিয়ে ফ্লোরে ফ্লোরে গিয়ে আপুদের আন্দোলনে নামার আহ্বান জানাতাম। আমরা প্রতি ফ্লোরে যেতাম, আপুদের বলতাম– ‘ভয় পেয়ো না, রুখে দাঁড়াও!’ রোকেয়া হল, যা ছিল ছাত্রলীগের শক্তিশালী ঘাঁটি, সেই জায়গায় বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি করা ছিল চ্যালেঞ্জিং। তবুও আমরা থামিনি। আমরা সংগঠিত হতে শুরু করি– আমি, আদিবা, আনিকা, শামসুন নাহারের অদিতি। আমাদের পাশাপাশি উঠে আসেন আরও অনেকে– আরজু আপু, পাতা আপু, সুলতানা, সুইটি আপু, মিতু আপু; যাদের নেতৃত্বে রোকেয়া হলে এক বিস্ফোরণ ঘটে বৈষম্যের বিরুদ্ধে।
আমাদের হতে হয়েছিল দমন-পীড়নের মুখোমুখি। ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত গ্রুপগুলো আন্দোলনের বার্তা ছড়াতে দিত না। মেয়েদের গেস্টরুমে নিয়ে হুমকি দেওয়া হতো– আন্দোলনে গেলে হল থেকে বের করে দেওয়া হবে।
আমি আগে কখনও এমন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিইনি। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান আমার কাছে শুধু রাজনীতি নয়, এক দায়বদ্ধতার শিক্ষা। এই হল, এই ক্যাম্পাস, এই দেশ আমার কাছে একটা দায়িত্ব। আমরা যে বাংলাদেশের স্বপ্নে রাজপথে নেমেছিলাম, স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছিলাম, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হবে।
আজ যখন স্বৈরাচার পড়ে গেছে, আমরা মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছি– তখনও আমি থেমে থাকতে পারি না। এই লড়াই শেষ হয়নি। হলগুলো মুক্ত করতে হবে দখলদার রাজনীতি থেকে। ডাকসু ছাড়া আর কোনো রাজনীতি যেন হলে ঢুকতে না পারে– এই দাবি এখন আমাদের।
আমি কারও তাঁবেদারি করিনি, করব না।
আমি মাথা নিচু করিনি, করব না। কারণ, আমি জুলাইয়ের বজ্রকণ্ঠ।
আমরা রোকেয়ার মেয়েরা, আমরা শুধু হলের তালা ভাঙিনি, আমরা ভয়ের শৃঙ্খল ভেঙে দিয়েছি।
লেখক: যুগ্ম আহ্বায়ক, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ।