স্বাস্থ্যবিষয়ক জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ডা. তাসনিম জারা, যিনি যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজের একজন চিকিৎসক ও ‘সহায় হেলথ’ এর সহপ্রতিষ্ঠাতা। বর্তমানে তিনি জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব।
২০২১ সালে নিজের ফেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ‘ভুলেও শিশুকে যেভাবে শোয়াবেন না’ শিরোনামে ডা. তাসনিম জারা একটি স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক ভিডিও আপলোড করেন। ভিডিওতে তিনি শিশুদের ঘুম পাড়ানোর স্বাস্থ্যকর পদ্ধতি (অবস্থান) এবং ভুল পদ্ধতির নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি আলোচনা করছেন। নিচে ডা. তাসনিম জারার মূল আলোচনা তুলে ধরা হলো-
ডা. তাসনিম জারা জানান, শিশুকে ভুল ভঙ্গিমায় (Position) ঘুম পাড়ানোর কারণে ১৯৭০ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত সারা বিশ্বে ঘুমের মধ্যেই বহু শিশুর মৃত্যু হয়। চিকিৎসকদের ভুল নির্দেশনা ও সচেতনতার অভাবই এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
একটা সময় বিশ্বজুড়ে শিশু চিকিৎসার এক বিখ্যাত বই মেনে হাজার হাজার বাবা-মা সন্তানকে উপুড় করে ঘুম পাড়াতেন, কিন্তু এর ফল হয়েছিল ভয়াবহ। কারণ, এই উপুড় করে ঘুমানোর অভ্যাসই বহু শিশুর অকাল মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিখ্যাত শিশু চিকিৎসক ডা. বেঞ্জামিন স্পক তাঁর বই ‘Baby and Child Care’–এ পরামর্শ দিয়েছিলেন, শিশুদের চিত করে না শুইয়ে উপুড় করে ঘুম পাড়াতে। তাঁর যুক্তি ছিল—
১. চিত হয়ে ঘুমালে শিশু যদি বমি করে, তবে শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে।
২. একই দিকে মাথা কাত করে রাখায় শিশুর মাথা চ্যাপ্টা হয়ে যেতে পারে।
ডা. বেঞ্জামিন স্পকের সেই বইটি এতটাই জনপ্রিয় হয় যে, কোটি কোটি কপি বিক্রি হয়, ৪২টি ভাষায় অনুবাদ হয়। ফলে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশের বাবা-মা এবং হাসপাতালগুলোও এই উপুড় করে শোয়ানোর পদ্ধতি অনুসরণ করতে শুরু করে।
এই সময় থেকেই শিশুদের মধ্যে হঠাৎ মৃত্যু (SIDS: Sudden Infant Death Syndrome) আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ৬ মাসের নিচের শিশুদের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায়। সম্পূর্ণ সুস্থ শিশু ঘুমের মধ্যে মারা যাচ্ছে, কিন্তু কেন, তা প্রথমে কেউ বুঝতে পারেনি।
গবেষকরা যখন এর পেছনের কারণ খুঁজতে শুরু করেন, তখন দেখতে পান উপুড় হয়ে ঘুমানো শিশুরাই বেশি মারা যাচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, উপুড় হয়ে ঘুমানো শিশুর মৃত্যুঝুঁকি চিত হয়ে ঘুমানোদের তুলনায় ১৩ গুণ বেশি।
ডা. স্পকের পরামর্শ ভুল, কিন্তু তা ধরা পড়ে অনেক দেরিতে
ডা. স্পকের যুক্তিগুলো যদিও যুক্তিপূর্ণ মনে হয়েছিল, পরে গবেষণায় প্রমাণিত হয় তা ভুল। যেমন—মাথা চ্যাপ্টা হওয়াটা স্বাভাবিক এবং সময়ের সঙ্গে ঠিক হয়ে যায়। আর শিশু যদি বমি করে, সেটি সে কাশি দিয়ে বের করে দিতে পারে।
স্পকের সঙ্গে আরও অনেকে একই পরামর্শ দিলেও, তাঁর বইয়ের জনপ্রিয়তার কারণে এই ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়ে। বহু ভালো পরামর্শের মাঝেও এই একটি ভুল পরামর্শ বহু শিশুর প্রাণ কেড়ে নেয়।
বিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং ব্যাপক গবেষণার পর যুক্তরাজ্যে শুরু হয় ‘Back to Sleep’ ক্যাম্পেইন। এতে করে শিশুমৃত্যুর হার অর্ধেকে নেমে আসে। এখনও এই বিষয়ে গবেষণা চললেও, বিশেষজ্ঞরা পরিষ্কারভাবে বলেন, শিশুকে সবসময় চিত করে ঘুম পাড়াতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর বয়স ১ বছর হওয়ার আগ পর্যন্ত সবসময় চিত করে ঘুম পাড়াতে হবে। এক কাত করে বা উপুড় করে শোয়ানো যাবে না। কারণ এতে মৃত্যুঝুঁকি ৭-৮ গুণ বেড়ে যায়।
ঘুমের সময় শিশুর শরীর যেন বিছানার সঙ্গে পুরোপুরি লেগে থাকে। শিশুকে একদম শুরু থেকেই চিত হয়ে ঘুমানোর অভ্যাস করাতে হবে।
না, জেগে থাকা অবস্থায় শিশুকে দিনে কয়েকবার উপুড় করে রাখা জরুরি। একে বলা হয় ‘Tummy Time’। এতে শিশুর ঘাড় ও কাঁধের পেশি শক্ত হয়, বসা-হাঁটা শেখা সহজ হয় এবং মাথাও সুন্দরভাবে বিকশিত হয়। তবে এটা করতে হবে নজরদারির মধ্যে এবং জেগে থাকা অবস্থায়।
১. শিশুর আশেপাশে কেউ ধূমপান করবেন না।
২. শিশুকে ৬ মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ দিন।
৩. শিশুর ঘুমের জায়গা পরিষ্কার রাখুন—কোনো পুতুল, বালিশ, কাঁথা যেন মুখ ঢেকে না দেয়।
৪. অতিরিক্ত গরম যেন না লাগে—খুব বেশি কাপড় পরাবেন না।
৫. ঘুমের শুরুতে শিশুকে চিত করে শোয়াতে হবে। ঘুমের মধ্যে সে নিজে পাশ ফিরলে সমস্যা নেই।
‘Back to sleep, Tummy to play’
ঘুমের সময় পিঠে, খেলাধুলার সময় পেটে—এই সহজ নিয়ম মানলেই শিশুর অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।