বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় আলিয়া মাদ্রাসা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত। যুগের পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে এই মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় এসেছে নানা সংস্কার ও আধুনিকায়ন। তবে দুঃখজনকভাবে, এখনো একটি জটিল সমস্যার মুখোমুখি এই ধারার শিক্ষার্থীরা—সেটি হলো সালভিত্তিক প্রশ্নপত্র। এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট কোনো বছরের প্রশ্নব্যাংক ঘিরেই পড়াশোনার এক নির্দিষ্ট সীমানায় আটকে ফেলা হয়, যা শিক্ষার মূল লক্ষ্য ও মানকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই সময় এসেছে—আলিয়া মাদ্রাসাকে সালভিত্তিক প্রশ্ন থেকে মুক্তি দেওয়ার জোর দাবি তোলার।
সালভিত্তিক প্রশ্নের কারণে শিক্ষার্থীরা সৃজনশীল চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। তাদের মধ্যে শুধু পাশ করার জন্য মুখস্থনির্ভরতা তৈরি হচ্ছে। একজন শিক্ষার্থী যখন জানে, যে জোড় সংখ্যার সালের প্রশ্ন জোড় সংখ্যায় আসবে যেমন যেটা ২০১৮ তে এসেছে সেটা ২০,২২,২৪ সে আসবে আবার বিজোড় হলে ১৭’১৯,২১ সে আসবে, তখন সে ওই নির্দিষ্ট প্রশ্নগুলো মুখস্থ করেই পরীক্ষায় ভালো ফল পেতে চেষ্টা করে। অথচ সত্যিকার জ্ঞান অর্জন ও আত্মোপলব্ধির সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হয়। এতে তারা পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও বাস্তব জীবনে কার্যকর জ্ঞান প্রয়োগ করতে অক্ষম হয়।
শুধু তাই নয়, এই প্রশ্নব্যবস্থা শিক্ষার ন্যায্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। কারণ, শিক্ষকরা অনেকে কেবল নির্দিষ্ট সালভিত্তিক প্রশ্নই পড়ান, নতুন বা মৌলিক কোনো ব্যাখ্যা শেখানোর চেষ্টা করেন না। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যকার বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপ স্থবির হয়ে পড়ে। শিক্ষার গভীরতা হারিয়ে গিয়ে তা হয়ে ওঠে পরীক্ষানির্ভর, যা জাতিকে ভবিষ্যতের যোগ্য নাগরিক গঠনে ব্যর্থ করে।
তাছাড়া, বর্তমান জাতীয় শিক্ষানীতির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে—চিন্তাশীল, উদ্ভাবনক্ষম ও মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ তৈরি করা। সালভিত্তিক প্রশ্নপদ্ধতি এই লক্ষ্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কারণ এতে শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট স্যাম্পল অনুযায়ী সাজানো কিছু তথ্য মুখস্থ করে নেয়—তা বিশ্লেষণ বা প্রয়োগের সুযোগ পায় না। অথচ একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার পাঠ্যবিষয়ের প্রতি উপলব্ধি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং সৃজনশীলতা দিয়ে।
আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ শিক্ষাবোর্ডের শিক্ষার্থীদের থেকে পিছিয়ে পড়ে। এর অন্যতম কারণ এই প্রশ্নব্যবস্থা। একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নপ্যাটার্নে বারবার চর্চা করায় তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সংকীর্ণ হয় এবং বিশ্বদরবারে প্রতিযোগিতায় তারা পিছিয়ে পড়ে। যদি মাদ্রাসা শিক্ষাকে জাতীয় শিক্ষার মূলস্রোতে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হয়, তাহলে অবশ্যই চিন্তাশীল ও প্রশ্নবহুল শিক্ষাপদ্ধতি চালু করতে হবে।
অবিলম্বে এই সালভিত্তিক প্রশ্নব্যবস্থা বাতিল করে সমসাময়িক, সৃজনশীল, বিশ্লেষণভিত্তিক প্রশ্ন চালু করা উচিত, যেখানে শিক্ষার্থীর চিন্তা, মনন ও মূল্যায়ন ক্ষমতার প্রকাশ ঘটবে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এবং মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরকে যৌথভাবে এমন একটি মূল্যায়ন পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে, যা আলিয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তমনা ও জ্ঞাননির্ভর করে তুলবে।
সবশেষে বলতেই হয়, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য পরীক্ষায় ভালো ফল নয়—বরং সত্যিকারের মানুষ গড়া। তাই শিক্ষা ব্যবস্থায় মেধার বিকাশ, মননের উৎকর্ষ এবং মুক্তচিন্তার চর্চা নিশ্চিত করতে হলে, আলিয়া মাদ্রাসা থেকে সালভিত্তিক প্রশ্নব্যবস্থা চিরতরে প্রত্যাহার করা সময়ের দাবি। এ দাবিতে প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সচেতন অভিভাবকদের ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।
লেখকঃ এস.এম.রেদোয়ানুল হাসান রায়হান
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া