চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছে রোহিঙ্গা বিষয়ক আন্তর্জাতিক কনফারেন্স। এতে অংশ নেন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বিশ্বিবদ্যালয়ের গবেষকবৃন্দ।
সোমবার (২৫ আগস্ট) চবির সমাজবিজ্ঞান অনুষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় এই কনফারেন্স।
দিনব্যাপী আয়োজিত এই কনফারেন্সের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়াহ্ইয়া আখতার, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চবি উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন, সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো: এনায়েত উল্যা পাটওয়ারী। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন চবির নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে সভাপতিত্ব করেন চবির নৃবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি ড. মো. আনোয়ার হোসেন।
সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো: এনায়েত উল্যা পাটওয়ারী বলেন, “ আমরা এক ধরনের যুদ্ধাবস্থায় বাস করছি যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। মানুষ তাদের কাজ, ঘরবাড়ি এমনকি জীবনের স্বাভাবিক আনন্দগুলো থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। আজ আমরা এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে একত্রিত হয়েছি। রোহিঙ্গারা শুধু মানবিক সংকট নয়, বরং আন্তর্জাতিক সংকটে নিমজ্জিত। ২০১৭ সালে এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী শিবিরে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তখন এটিকে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এ সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।”
এসময় উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, “ রোহিঙ্গা ইস্যু নিঃসন্দেহে একটি জটিল সংকট। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে এর সমাধানের চেষ্টা করা হলেও সমস্যাটি এখনো বিদ্যমান, বরং পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। কেউ কেউ মনে করেন বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা ভালোভাবে সেবা পাচ্ছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো তাদের মনে নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তার অনুভূতি এখনো প্রবল। ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় ১৯৭০ এর দশকে যেমন গণহত্যার সাক্ষী হতে হয়েছে, তেমনই আজও আমরা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর নির্মম নির্যাতন প্রত্যক্ষ করছি।”
উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান তাঁর বক্তব্যে বলেন, “ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত রোহিঙ্গা পরিস্থিতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা এবং কীভাবে আমরা সম্মিলিতভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে পারি সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গবেষণা ও নীতি পর্যায়ে আমাদের যৌথ পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। এই সম্মেলন আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম, যেখানে আমরা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে নিজেদের গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতা একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করতে পারছি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এই সম্মেলনের আলোচনাগুলো শিক্ষার্থী, গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং বিশেষ করে বাংলাদেশ সরকারকে রোহিঙ্গা ইস্যু মোকাবিলায় সহায়ক হবে।”
৮ম রোহিঙ্গা জেনোসাইড রিমেম্বারেন্স ডে ২০২৫ এর উপলক্ষে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে তিন পর্বে বিভক্ত একাডেমিক সেশনের আয়োজন করা হয়। এতে নিজেদের গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বিশ্বিবদ্যালয়ের গবেষকবৃন্দ।
একাডেমিক সেশনের প্রথম পর্বে সেশন চেয়ার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চবির নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। এতে গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. রামা ইসলাম, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুর রশীদ, চেক প্রজাতন্ত্রের পালাস্কি ইউনিভার্সিটি ওলোমমোক এর এশিয়ান স্টাডিজ বিভাগের ড. মনিকা ভার্মা, চবির সমাজতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন। এছাড়া এতে গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মালয়েশিয়ার পিএইচডি ক্যান্ডিডেট মো. ইলিয়াস, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাশিতাহ হামিদি ও মোহাম্মদ নুরবায়ুসরি বিন বাহারুদ্দিন। একাডেমিক সেশনের প্রথম পর্বে এক্সপার্ট ডিসকাসেন্ট হিসেবে বক্তব্য রাখেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকার কর্মী রাজিয়া সুলতানা।
একাডেমিক সেশনের দ্বিতীয় পর্বে সেশন চেয়ার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চবির নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আলা উদ্দিন। এতে গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওগ্রাফি এন্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল কাদের, একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুল মালেক, চবির আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. রকিবা নবী, ইউরোপীয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাখাওয়াত সাজ্জাত সেজান, ব্রাকের লাইভলিহুড এন্ড স্কিল সেকশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ড. মো. শাহজাহান আলী সরকার, ভারতের জওহরলাল নেহেরু ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের জুনিয়র রিসার্চ ফ্যালো আশিষ কুমার। একাডেমিক সেশনের দ্বিতীয় পর্বে এক্সপার্ট ডিসকাসেন্ট হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রখ্যাত রোহিঙ্গা ইতিহাসবিদ ও রোহিঙ্গা নেতা আমান উল্লাহ।
একাডেমিক সেশনের তৃতীয় পর্বে সেশন চেয়ার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চবির নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. খাদিজা মিতু। এতে গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চবির রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আল আমিন রাব্বি, যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস এন্ড পলিটিকাল সায়েন্সের জিওগ্রাফি এন্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগের পিএইচডি ক্যান্ডিডেট বিষ্ণু প্রসাদ, আইসিডিডিআরবি এর রিসার্চ অফিসার মোহাম্মদ শাহেদ মুমিন। একাডেমিক সেশনের তৃতীয় পর্বে এক্সপার্ট ডিসকাসেন্ট হিসেবে বক্তব্য রাখেন চবির নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এন এম সাজ্জাদুল হক।
এছাড়া অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে এক্সক্লুসিভ রাউন্ড টেবিল এর আয়োজন করা হয়। সমাজবিজ্ঞান অনুষদের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এই এক্সক্লুসিভ রাউন্ড টেবিল এ মডারেটর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চবির নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নাসির উদ্দিন। এতে রিসোর্স পার্সন হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চবির আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুক, প্রখ্যাত রোহিঙ্গা ইতিহাসবিদ ও রোহিঙ্গা নেতা আমান উল্লাহ। এছাড়া এতে উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকার কর্মী রাজিয়া সুলতানা।