জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল প্রকার অনুষ্ঠান ও সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে এই আইনকে অমান্য করে “প্রাক্তন জাতীয়তাবাদী শিক্ষার্থী ফোরাম’র” উদ্যোগে সাবেক ছাত্রদল নেতা মরহুম হাবিবুর রহমান কবিরের মাগফেরাত কামনায় দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কতৃক জারিকৃত প্রজ্ঞাপন অনুসারে যা স্পষ্টত বেআইনি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং জাকসু’র সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান এবং জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাফরুহী সাত্তার।
মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে এ দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং জাকসু’র সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান, জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাফরুহী সাত্তার, জাবি শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়কসহ অন্যান্য ছাত্রদলকর্মীবৃন্দ।
এর আগে গত ১৯ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এ বি এম আজিজুর রহমান মুকুল স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন-২০২৫ উপলক্ষ্যে ক্যাম্পাসে নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০ আগস্ট থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সকল ধরনের অনুষ্ঠান, সভা-সমাবেশ, কর্মসূচী এবং মটরসাইকেল চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এদিকে জাকসু নির্বাচন কমিশন কতৃক ইতোমধ্যে প্রকাশিত জাকসু নির্বাচন আচরণবিধি’র ৭ নং বিধির ক এবং খ ধারায় নির্বাচনী সভা-সমাবেশ ও মিছিল সংক্রান্ত বিধি-নিষেধ সম্পর্কে বলা আছে- (ক) ক্যাম্পাসে যে কোনো ধরনের সভা-সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ থাকবে। এবং (খ) ধারায় বহিরাগতদের সম্পর্কে বলা হয়েছে- সকল বৈধ ভোটার ও প্রার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী ব্যতিরেকে অন্য যে কেউ ক্যাম্পাসে বহিরাগত হিসেবে বিবেচিত হবেন।
রেজিস্ট্রার কতৃক জারিকৃত প্রজ্ঞাপন এবং নির্বাচন কমিশন কতৃক প্রকাশিত আচরণবিধি’র পরে আজকের এই আয়োজনটি নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের বহি:প্রকাশ এবং আসন্ন জাকসু নির্বাচনের জন্য হুমকি হিসেবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বাগছাস) আহ্বায়ক আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল বলেন, আজকের অনুষ্ঠিত দোয়া মাহফিলের অনুষ্ঠানটির ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং জাকসু নির্বাচন কমিশনের আরেকটু দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত ছিল বলে আমরা মনে করছি। নির্বাচনী আচরণবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন করা হয়েছে আজকের অনুষ্ঠানে। সেই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক, মাননীয় উপাচার্য এবং জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য স্বয়ং সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, যেহেতু আচরণবিধি অনুযায়ী সকল ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ, তাই আজকের আয়োজনটি কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। আবার আয়োজনটি করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের ব্যানারে, নির্বাচনবিধি অনুসারে যারা স্পষ্টভাবে “বহিরাগত” বলে বিবেচিত এবং যাদের নির্বাচনী এই সময়টুকুতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।
তিনি জানান, নির্বাচনের এই সময়ে প্রশাসন ও জাকসু নির্বাচন কমিশন থেকে এরকম আচরণ কাম্য নয়। এটি তাদেরকে এবং আসন্ন জাকসু নির্বাচনের নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিতের বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে৷ আমরা বাগছাস থেকে প্রশাসনের এহেন কর্মকাণ্ডের লিখিত জবাদ চাই।
এ বিষয়ে জাবি শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আজকের এই ঘটনা নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন এবং এটি নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আমরা আরও দেখেছি, একটি গোষ্ঠী এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রত্যেকটি আবাসিক হলে এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে ব্যানার ঝুলিয়েছে। একটি স্বার্থান্বেষী মহল আসন্ন জাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে অতীত ইতিহাস তুলে পোস্টারিং, ব্যানার ঝুলানোর বিষয়টিকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের পাশাপাশি নির্বাচনকে বানচাল করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে বলেও মনে করেন তিনি।
এ বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর বলেন, আজকের প্রোগ্রামটি জাবি ছাত্রদল কতৃক আয়োজিত হয়নি বরং “প্রাক্তন জাতীয়তাবাদী শিক্ষার্থী ফোরাম’র” উদ্যোগে এটি করা হয়েছে। এখানে আমরা জাবি ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা দাওয়াত পেয়ে অংশ নিয়েছিলাম।
তিনি আরও বলেন, এটি ছিল আমাদের ছাত্রদলের সাবেক এক বড়ভাই, কবির ভাইয়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে দোয়া মাহফিলের অনুষ্ঠান। কাজেই এই দোয়া মাহফিলের আয়োজন কোনোভাবেই আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছে বলে মনে করি না।
আচরণবিধি অনুযায়ী, স্পষ্টত সাবেক শিক্ষার্থীরা বহিরাগত হিসেবে বিবেচিত হবেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের অনেকে আমাদের ক্যাম্পাসের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অনেকে অন্যান্য ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী ছিল। তাদের বহিরাগত কিভাবে বলেন?
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কতৃক প্রজ্ঞাপন জারির পরেও কিভাবে আজকের দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হলো এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আজিজুর রহমান মুকুল বলেন, আজকের অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আমি কোনোভাবেই অবগত ছিলাম না। তবে ক্যাম্পাসে নির্বাচনী পরিবেশ বজায় রাখতে সকল ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এটি উপেক্ষা করে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন সভা-সমাবেশ করলে এটি সম্পূর্ণ বেআইনী।
আজকের আয়োজিত অনুষ্ঠানটি বেআইনী ছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি যেহেতু একটি দোয়া মাহফিলের আয়োজন ছিল তাই এটাকে এর আওতায় রাখা মুশকিল। তবে সকল ধরনের অনুষ্ঠান বলতে এটিও এর আওতায় পড়ে। এখন এই আয়োজনের অনুমতি থাকলে এটাকে কিছুটা শিথিলভাবেই দেখছেন তিনি।
এ বিষয়ে জাকসু সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, আজকের অনুষ্ঠানটি ছিল একটি দোয়া মাহফিলের অনুষ্ঠান। এটাকে ভিন্নভাবে দেখার কিছু নেই। এখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো দোয়া মাহফিলের অনুষ্ঠানে বাধা প্রদান করতে পারে না। আর আজকের অনুষ্ঠানের জন্য তারা অনুমতি নিয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে তাদের পরামর্শ দিয়েছিলাম যেনো এটি না করে। তবে তারা বলেছেন প্রতি বছরের ধারাবাহিকতায় তারা এই দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে আসছে। তারা এটি শেষ করেই আবার ফিরে যাবেন। তাই এটাকে কিছুটা শিথিল করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, তারা প্রতি বছরই দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে থাকে। তবে আমরা প্রথমে বলেছি না করলে ভালো হয়। তারা জানিয়েছে শুধু দোয়া করবে এবং চলে যাবেন। তাই উর্ধতনের মৌখিক অনুমতি নিয়ে তারা দোয়া মাহফিল করেছে। তবে না করলে ভালো হতো।