২০২৪ সালের জুলাই সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে সময়ের দাবি বলে অভিহিত করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। তার ভাষায়, ‘স্বৈরাচার পতনের আর কোনো বিকল্প পথ ছিল না; আওয়ামী লীগ নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে জনগণের সকল শান্তিপূর্ণ পথ রুদ্ধ করে দিয়েছিল।’
বাসসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শাসক দলের দমন-পীড়ন, সাংস্কৃতিক বিভাজন এবং ছাত্রদের মধ্যে বিকাশমান রাজনৈতিক সচেতনতার সম্মিলিত ফলাফলই ছিল এই গণঅভ্যুত্থান।
জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট, ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠন নিয়ে এসময় কথা বলেছেন মাহফুজ আলম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাসসের প্রতিবেদক জুবায়ের ইবনে কামাল।
‘বিকল্প কোনো পথ ছিল না’
মাহফুজ বলেন, ‘আওয়ামী লীগ শাপলা-শাহবাগ বিভাজনের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছিল— ইসলামিস্ট বনাম সেক্যুলার। এই বিভাজনের আড়ালে ২০১৪ সালের নির্বাচন কুক্ষিগত করা হয়েছিল। এরপর ২০১৫ সালের বিএনপির অসহযোগ আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়ক ও ভ্যাট আন্দোলনের মতো ঘটনাগুলো বিরোধীদল শূন্য একটি বাংলাদেশের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।’
তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৮ সালের রাতের নির্বাচনের পর তরুণদের মাঝে যে গণতান্ত্রিক চাপ তৈরি হয়েছিল, তা-ই দীর্ঘমেয়াদে অভ্যুত্থানের ভিত্তি তৈরি করে। ‘এটা ছিল ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এক নতুন প্রজন্মের পলিটিক্যাল প্রেসার গ্রুপের ফল।’
সাংস্কৃতিক ঐক্য ও মধ্যপন্থার জন্ম
আন্দোলনের একতা প্রসঙ্গে মাহফুজ বলেন, ‘আন্দোলন তখনই সফল হয় যখন সাংস্কৃতিক ভিত্তি থাকে। শাপলা-শাহবাগের মতো বিভাজনের রাজনীতির বাইরে আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করতে চেয়েছি, যারা ইসলামিস্ট নয়, আবার ইসলামোফোবিকও নয়। এমন একটি মধ্যপন্থার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলাম আমরা।’
তিনি জানান, মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে সেই রেয়ার ব্র্যান্ড, যারা আলেমদের বিশ্বাসযোগ্য মনে হতো আবার সেক্যুলারদের কাছেও গ্রহণযোগ্য ছিল।
পেছনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব
সাক্ষাৎকারে মাহফুজ বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে কেউ সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, কেউ আড়াল থেকে। আমরা এটাকে থিয়েটারের মতো রোল-প্লে করে দেখেছি— কে সামনে থাকবে, কে পেছনে কাজ করবে সেটা খুব একটা ম্যাটার করতো না।’
তিনি জানান, আন্দোলনের সমন্বয় ও কৌশলগত দিকগুলো নিয়ে বিভিন্নজন কাজ করেছেন। ‘নাহিদ ইসলামকে সামনে আনা হয়েছিল এই কারণেই যে সে ছিল অপেক্ষাকৃত নতুন, পরিচ্ছন্ন একটি মুখ। অন্যদিকে আমি, আসিফ মাহমুদ, আকরাম, শোয়েব বা নাসির উদ্দিন পাটোয়ারি আমরা পেছনে থেকেই সাংগঠনিক কাজ করেছি।’
ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন পদ্ধতির পক্ষে
জুলাই গণহত্যার বিচার প্রসঙ্গে মাহফুজ বলেন, ‘সত্য স্বীকার করার প্রক্রিয়া ছাড়া বিচার সম্ভব নয়। আপনি অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারেন, কিন্তু পাপীকে নিষ্পাপ করতে পারেন না। এজন্য ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন পদ্ধতিই কার্যকর।’
তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষক যদি সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ না নিয়েও গণহত্যাকারী সরকারের সমর্থক হন, তাহলে তারও নৈতিক দায় আছে। তাকে তার অবস্থান স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে সামনে আসতে হবে।’
নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রয়োজন
অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সংস্কার প্রসঙ্গে মাহফুজ বলেন, ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তখনই সম্ভব, যখন বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংস্কার হবে। বিরোধী দলকে দমনের যে সংস্কৃতি আওয়ামী লীগ তৈরি করেছিল, তা ভাঙতে না পারলে নতুন রাজনীতি আসবে না।’
তিনি ভারতের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘নেহরু যেমন বিরোধী দলকে দাঁড় করিয়ে গণতন্ত্র চর্চা করতে চেয়েছিলেন, শেখ মুজিব তা করেননি। গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচন নয়; সম্মান, সহাবস্থান, ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।’
সূত্র: বাসস